মহিলাদের পাতা

নিজে বাঁচুন এবং আহাল-পরিবারকে বাঁচান!


হাজেরা বিনতে ইবরাহীম
শিক্ষিকা, বেলটিয়া কামিল মাদরাসা, জামালপুর।

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে- তাদেরকে আর্দশ সন্তান হিসাবে গড়ে তোলা। আর ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত ও আদর্শবান করে গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য হবে তাদেরকে জাহান্নাম হ’তে রক্ষা করা। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَاراً وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلاَئِكَةٌ غِلاَظٌ شِدَادٌ لاَ يَعْصُوْنَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ-

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও স্বীয় পরিবারবর্গকে আগুন (জাহান্নাম) হ’তে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে অত্যন্ত কর্কশ, রূঢ় ও নির্মম স্বভাবের ফেরেশতা নিয়োজিত থাকবে, যারা কখনই আল্লাহর কথা অমান্য করে না এবং নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে’ (তাহরীম ৬)

আজকাল পিতা-মাতা তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা দানের জন্য অনেক চেষ্টা করে থাকেন। এমনকি তারা সন্তানকে শুধু স্কুলে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হন না; বরং ক্লাসের পরে প্রাইভেট, কোচিং ইত্যাদির মাধ্যমে সন্তানদেরকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে অভিভাবকরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছেন যে, তাদের সন্তানের উপর আল্লাহ কোন বিদ্যা শিক্ষা করা ফরয করেছেন?

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’ (আলাক্ব ১)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ  ‘বিদ্যা শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরয’।[1] আর সেটা হ’ল কুরআন ও ছহীহ হাদীছের শিক্ষা তথা দ্বীনী শিক্ষা। এ শিক্ষায় যদি সন্তানদের শিক্ষিত করে না তোলা হয়, তাহ’লে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। কেননা দুনিয়াবী শিক্ষা হচ্ছে বস্ত্তবাদী শিক্ষা। আর দ্বীনী শিক্ষা হচ্ছে আখেরাতমুখী শিক্ষা। যে শিক্ষা মানুষকে তার স্রষ্টার সন্ধান দেয় এবং পরকালে চূড়ান্ত সফলতার দিকে মানুষকে ধাবিত করে। দ্বীনী শিক্ষা ঠিক রেখে অপরাপর জ্ঞানার্জন করা যেতে পারে। তবে কখনো দ্বীনী শিক্ষাকে উপেক্ষা করে অন্য কোন বিদ্যা অর্জন করা সমীচীন নয়। এতে বরং পদচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই থেকে যায়।

সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত ও আদর্শবান করে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতাই প্রধানত দায়িত্বশীল। কেননা পারিবারিক স্কুলেই তার শিক্ষার হাতে খড়ি। সেকারণ পিতা-মাতাকে দায়িত্ব সচেতন হ’তে হবে। অন্যথা ক্বিয়ামতের দিনে লা জওয়াব হয়ে যেতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالأَمِيْرُ الَّذِىْ عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُوْلٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ وَهِىَ مَسْئُوْلَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُوْلٌ عَنْهُ أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ-

‘সাবধান তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সুতরাং শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাকে পরিবারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর সংসার এবং সন্তানের উপর দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তাকে এ দায়িতব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এমনকি দাস-দাসীও তার মালিকের সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সেইদিন তাকেও তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। অতএব মনে রেখো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই ক্বিয়ামতের দিন এই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’।[2]

অতীব দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, আজকাল অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত না করে দুনিয়াবী বিষয়ে শিক্ষা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের উচিৎ দুনিয়াবী শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনী শিক্ষায় সন্তানদেরকে শিক্ষিত করা। কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদীছে আল্লাহ জাহান্নামের ভয়াবহতা পেশ করেছেন এবং পরিবারের প্রধানকে কঠোরভাবে সাবধান করেছেন এবং পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং পিতা-মাতার পক্ষ থেকে সন্তান-সন্ততির প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ হচ্ছে, তাদেরকে সুশিক্ষা ও সদুপদেশ দিয়ে, আল্লাহর ভয় দেখিয়ে ভাল কাজ-কর্মে অভ্যস্ত করা এবং এর মাধ্যমে পরকালে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে উল্লিখিত লোক্বমান কর্তৃক স্বীয় পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশবাণী বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। উপদেশগুলো ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হ’ল-

(১) লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে শিরক থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন। যা কুরআনে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে-

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لاَ تُشْرِكْ بِاللهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ.

‘স্মরণ কর, যখন লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বললেন, হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় যুলুম’ (লোক্বমান ১৩)। উল্লেখ্য যে, শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُّشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ. ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’ (মায়েদাহ ৭২)। তিনি আরো বলেন, إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُّشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَّشَاءُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার গোনাহ ক্ষমা করেন না। তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন’ (নিসা ৪৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ - ‘তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী হয়েছে, তুমি আল্লাহর সাথে শরীক স্থির করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার ৬৫)

(২) লোকবমান তাঁর ছেলেকে সব ধরনের শিরক পরিহার করার উপদেশ প্রদানের পর আল্লাহর ক্ষমতা অবহিত করেন। আল্লাহর জ্ঞান অসীম। তিনি সবকিছু অবগত। তোমাকে সর্বপ্রকার গোপন ও প্রকাশ্য অন্যায় থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরকালে বিচারের দিনে অণু পরিমাণ ভাল কিংবা মন্দ কাজের ফল ভোগ করার জন্যও প্রস্ত্তত থাকতে হবে। লোক্বমান বলেন, يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِيْ صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللهُ إِنَّ اللهَ لَطِيْفٌ خَبِيْرٌ. ‘হে বৎস! ক্ষুদ্র বস্ত্তটি যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নীচে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত’ (লোক্বমান ১৭)

(৩) দুনিয়াতে যে কাজ একান্ত যরূরী তা হচ্ছে ছালাত আদায় করা। লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে ছালাতের উপদেশ দিয়ে বলেন, يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلاَةَ ‘হে প্রিয় বৎস! ছালাত কায়েম কর’ (লোক্বমান ১৭)। উল্লেখ্য যে, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ছাঃ)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন,وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلاَةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا  ‘আপনি আপনার পরিবারকে ছালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও এর উপর অবিচল থাকুন’ (ত্ব-হা ১৩২)

উপরোক্ত আয়াত দু’টিতে আল্লাহ তা‘আলা পিতা-মাতাকে সন্তানদের উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে ছালাত শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে তাকীদ করেছেন। কেননা ছালাত অশ্লীল কাজ হ’তে মানুষকে বিরত রাখে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ الصَّلاَةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ‘নিশ্চয়ই ছালাত অশ্লীল এবং মন্দ কাজ হ’তে বিরত রাখে’ (আন‘কাবূত ৪৫)। যদি কেউ সঠিকভাবে ছালাত আদায় করে, তাহ’লে সে সহজে মন্দ কাজ করতে পারবে না।

(৪) ভালকাজের আদেশ ও মন্দকাজের নিষেধ করার উপদেশ দিয়ে লোক্বমান তাঁর প্রিয় পুত্রকে বলেন, وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ ‘ভাল কাজের আদেশ দাও এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ কর’ (লোক্বমান ১৭)

ঈমানদার ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকতে পারে না। বরং পরিবার, সমাজ ও জাতির ভাল-মন্দ সম্পর্কে লক্ষ্য রাখা তার কর্তব্য। তার অন্যতম দায়িত্ব হ’ল সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা। আর সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার কারণে তাকে নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তারা যাতে হক্বের উপরে সুদৃঢ় থাকে এবং সাহসিকতার সাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে এমন শিক্ষা দিতে হবে। শক্তিধর যালিমদের মুখোমুখি দাঁড়াতেও যেন তারা ভয় না পায়। অন্যায়কে নীরবে সহ্য করার মতো কাপরুষতা যেন তাদের ভিতরে কখনো প্রবেশ করতে না পারে, এ শিক্ষাও সন্তানদেরকে দিতে হবে।

(৫) ছবর বা ধৈর্য-সহিষ্ণুতার নির্দেশ দিয়ে লোক্বমান তাঁর পুত্রকে বলেন, وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُوْرِ ‘আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ কর। এটাতো দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (লোক্বমান ১৭)। বিপদে-আপদে মুষড়ে না পড়ে সন্তানরা যেন ধৈর্য ধারণ করে এ দীক্ষা তাদেরকে দিতে হবে।

(৬) লোক্বমান তাঁর পুত্রকে মানুষ থেকে বিমুখ না হওয়ার উপদেশ দিয়ে বলেন, وَلاَ تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ  ‘তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না’ (লোক্বমান ১৮)

মূলতঃ সন্তানকে এ শিক্ষা দিতে হবে যে, তারা যেন নিজেদেরকে সাধারণ মানুষ মনে করে। নিজেকে বড় ভেবে কখনো যেন অন্যের দিক হ’তে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। কেননা অন্যকে অবজ্ঞা করে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অহংকারের নামান্তর। আর অহংকার মানুষকে সত্য হ’তে বিমুখ রাখে। যেমন অহংকারের কারণে সত্য হ’তে বিমুখ হয়েছিল ইবলীস। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلاَئِكَةِ اسْجُدُوْا لِآدَمَ فَسَجَدُوْا إِلاَّ إِبْلِيْسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِيْنَ- ‘আর আমি যখন ফিরিশতাগণকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলে সিজদা করল, সে অগ্রাহ্য এবং অহংকার করল। আর কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল’ (বাক্বারাহ ৩৪)

(৭) লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে অহংকার না করার উপদেশ দিয়ে বলেন, وَلاَ تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ ‘যমীনের উপর অহংকার বশে চলাফেরা কর না। আল্লাহ কোন আত্মগর্বী ও দাম্ভিককে পসন্দ করেন না’ (লোক্বমান ১৮)। এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, দাম্ভিক ও অহংকারীরা আল্লাহর ভালবাসা লাভ করতে পারে না।

অহংকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন, وَلاَ تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُوْلاً ‘তুমি যমীনে দম্ভ ভরে চলাফেরা করো না। তুমি পদভারে কখনোই যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনই পর্বত প্রমাণ হ’তে পারবে না’ (বাণী ইসরাঈল ৩৭)

(৮) লোক্বমান তাঁর পুত্রকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপদেশ দিয়ে বলেন, وَاقْصِدْ فِيْ مَشْيِكَ ‘আর তুমি তোমার চাল চলনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর’ (লোক্বমান ১৯)। মধ্যম পন্থায় চলাচলের কারণে মানুষ সম্মানিত হয়। তাই সন্তানদেরকে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের উপদেশ দিতে হবে।

(৯) লোক্বমান তাঁর পুত্রকে নিম্নস্বরে কথা বলার উপদেশ দিয়ে বলেন, وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيْرِ ‘আর তোমার কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিশ্চয়ই স্বরের মধ্যে সবচেয়ে কর্কশ আওয়াজ হ’ল গাধার আওয়াজ’ (লোক্বমান ১৯)

উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা শালীনতা বিরোধী। সভ্য সমাজ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা পসন্দ করে না। তাই সন্তানদেরকে নরম ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা শিক্ষা দিতে হবে।

পিতা-মাতার দায়িত্ব হ’ল, সন্তানকে লোক্বমানের ন্যায় উপদেশ দেয়া, যা তিনি তার প্রিয় পুত্রকে দিয়েছিলেন। এ দায়িত্ব পালন করা পিতা-মাতার একান্ত কর্তব্য। হাদীছে এসেছে,

 عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم كُلُّ نَفْسٍ مِنْ بَنِيْ آدَمَ سَيِّدٌ، فَالرَّجُلُ سَيِّدُ أَهْلِهِ، وَالْمَرْأَةُ سَيِّدَةُ بَيْتِهَا-

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আদম সন্তান প্রত্যেকেই কর্তা। সুতরাং পুরুষ তার পরিবারের কর্তা এবং নারী তার ঘরের কর্তী’।[3]

এ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, সন্তানকে আদর্শ সন্তান রূপে গড়ে তোলার দায়িত্ব পিতা-মাতার। পিতা-মাতার কারণে  সন্তান আদর্শবান হয় এবং তাদের কারণেই সন্তান দুশ্চরিত্রের অধিকারী হয়। তেমনি পিতা-মাতার কারণে সন্তান বিভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করে থাকে। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّهُ كَانَ يَقُوْلُ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَا مِنْ مَوْلُوْدٍ إِلاَّ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ وَيُمَجِّسَانِهِ-

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তান ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতা-পিতা তাকে ইহুদী, খৃষ্টান ও অগ্নি উপাসক রূপে গড়ে তোলে’।[4]

অপরদিকে সন্তানকে আদর্শবান রূপে গড়ে তুলতে পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হ’ল তাদের জন্য সৎ সঙ্গী খুঁজে বের করা। যেমন বলা হয়ে থাকে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

عَنْ أَبِىْ مُوْسَى رضى الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَثَلُ الْجَلِيْسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيْرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيْحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الْكِيْرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيْحًا خَبِيْثَةً-

আবু মূসা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘উত্তম সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মিশক আম্বর ও হাপর ওয়ালার ন্যায়। মিশক আম্বর ওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে অথবা তার কাছ থেকে কিছু ক্রয় করতে পারবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি সুগন্ধি লাভ করবে। আর হাপর ওয়ালা তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দিবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে’।[5] এই হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সঙ্গীর কারণে সন্তান বিভিন্ন স্বভাবের হ’তে পারে। তাই এই দিকে পিতা-মাতার বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিৎ।

পরিশেষে বলব, পিতা-মাতা সন্তান নিয়ে পরিবার। পিতা-মাতা পরিবারের মূল। সন্তানকে আদর্শবান করে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদেরই। তাই তাদেরকে এ বিষয়ে যত্নবান হ’তে হবে। আর সন্তান আদর্শবান ও ইসলামী মন-মানসিকতায় গড়ে উঠে যথাযথ ইবাদত করতে পারলে জান্নাতে যেতে পারবে। তাই প্রত্যেক পিতা-মাতাকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী হয়ে নিজেকে ও তার পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!

 


[1]. ইবনু মাজাহ, শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত হা/২১৮

[2]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫

[3]. ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫৬৫; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২০৪১

[4]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯০

[5]. বুখারী হা/৫৫৩৪